কথাসাহিত্যিক সুলতানা দিল আফরোজের স্মৃতির আঙিনায়- শৈশব ও বাবাবেলা।

পাঠকের আনুগত্য ও আকর্ষণ কেবল লেখকের সৃষ্টিকর্মের মান ও উৎকর্ষের সঙ্গে সম্পর্কিত নয়, তার জীবনাচার ও বিচিত্র বহুমুখী কর্মকান্ড় ও পালন করতে পারে একটা ভুমিকা। কারন, লেখকসত্বা কেবল লেখার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না, সেটি লেখকের জীবন ও সৃষ্টির ওপর যেমন প্রভাব বিস্তার করতে পারে, তেমনই পারে পাঠকের অন্তর্গত কৌতুহল ও আকর্ষণকে আনুগত্যের নিগড়ে বাঁধতে। আবার, লেখকের জীবনে খন্ড় খন্ড় অভিঞ্জতার সমাবেশ ঘটে। সেই সমাবেশে নানা রঙ- আনন্দ, বেদনা, সুখ ও দুঃখের অনির্বচনীয় এক অনুরণন নানা বর্ণবিভায় উদ্ভাসিত হয়। সুর্নিদিষ্ট আকার বা মাত্রা অজানা, জানা থাকে না আগামীকালের কোনো বিন্দুর তিলমাত্র- তারপরও লেখক ফিরে তাকাতে চায় নিজের ফেলে আসা অমল স্মৃতির দিকে, এবং সে দেখতে পায় পারিবারিক, সামাজিক বহু রঙে তার জীবন ছেয়ে আছে। মুহুর্তের পরতে পরতে ছাওয়া অনিশ্চয়তামাখা দিনরাত্রির মাঝে মেঘ মেদুর বর্ণচ্ছটা ও কথকতা তার একার সঞ্চয় হলেও যখন তা প্রকাশিত হয় শব্দে- বাক্যে, তখন তা সমগ্রের হয়ে নিশ্চিত দাঁড়ায়। তেমনি কথা সাহিত্যিক সুলতানা আফরোজও এই ধারাবাহিকতার বাইরে নন।

সুলতানা দিল আফরোজা এ সময়ের একজন নিবিষ্ট ও নির্জন কথা সাহিত্যিক। স্মৃতিচারণ নয়, যেন হৃদয়ক্ষরণের বিষাদ বাঁশি বাজিয়ে যাচ্ছেন অপূর্ব শিল্পমুগ্ধতায়। প্রাত্যহিক পরিচর্যায় এঁকে যাচ্ছেন যাপিত জীবনের মর্মলিপি। লেখকের প্রথম গ্রন্হ ‘ আমার শৈশব, আমার বাবাবেলা ‘। এখানে লেখকের বাবার বিশাল জীবনের ব্যাখা ও বিস্তৃতি উঠে এসেছে। মূলত এটি পারিবারিক পুরাণ। সেই পুরাণের পরতে পরতে শব্দের গাঁথুনি সম্পূর্ন স্বতন্ত্র এবং সাম্প্রতিকতা ও চিরন্তনতার এক অনন্য সম্মিলনের প্রতীক। তাঁর বইয়ের ভেতরে একই সাথে প্রেম, ক্রান্তিকালের দহন, মৃত্যুচিন্তা এবং কালচেতনা সব সংমিশ্রিত হয়ে অবির্ভূত হয়ে থাকে যা একমাত্র লেখকদের জন্য সম্ভব। তাই যে পৃথিবীতে সব সম্পর্কই রক্তের শিরাময়, ছায়াময়, মায়াময়, সব সম্পর্কই নিদারুণ স্বপ্নকাতর, সেই পৃথিবীর জন্যেই কথাসাহিত্য সুলতানা দিল আফরোজ বেশী কাতর। সেই কাতরে অবলীলায় সৃষ্টি করেন দ্বিতীয় গ্রন্হঃ ‘ স্মৃতির আঙিনায় ‘। এটি শুধু আত্বজৈবনিক প্রবন্ধই নয়, একটি নান্দনিক দলিল। লেখকের প্রজ্ঞা, জীবনবোধ আর মর্মস্পর্শী বর্ণনা এই বইটিকে করে তুলেছে অনন্য।

কথাসাহিত্যিক সুলতানা দিল আফরোজ তাঁর বইতে নাগরিক প্রবণতায় যথোপযুক্ত দান করেছেন আর এগিয়ে নিয়েছেন বোধের সীমানাকে। প্রখরভাবে নাগরিক তিনি, নাগরিক বৈশিষ্ট্য তার মৌলুউপজীব্য কিন্তু সেটা কায়েম করতে গিয়ে ফিরিয়ে নিয়েছেন পাঠককে চিরন্তন ও চিরায়ত মুগ্ধতার প্রকৃতিতে। লেখক এতে চিত্ররূপে বর্ণিল, অঙ্কনে আবীরময়, বহুবর্ণাভায় প্রতীকায়িত, সমৃদ্ধময়। উপযুক্ত মানস- বিষয়ীতে, আধার ও আধেয়র আবর্তে। দীর্ঘদিন পরিচর্যায় তিনি সৃষ্টি করেছেন- ‘ আমার শৈশব আমার বাবাবেলা’ র পর ‘ স্মৃতির আঙিনায় ‘। পাঠক মহলে যথেষ্ট সাঁড়া তুলেছে প্রকাশিত এই বই দুটি। তিঁনি বসে নেই, কলম চলছে দ্রুত গতিতে। পাঠককে উপহার দিতে চান তথ্যবহুল সমৃদ্ধ আরো অজানা বিষয় নিয়ে নতুন কিছু, প্রতিক্ষণে সৃষ্টিঘোরে আচ্ছন্ন এ কথাসাহিত্যক। সৃষ্টির শৈল্পিক অঙ্গীকারে আবদ্ধ থেকে দর্শন এবং সৌন্দর্যের নান্দনিক সংমিশ্রণে নব নির্মাণে প্রাগ্রসর। তাঁর লেখায় সংহত উচ্ছারণ ও বহুমাত্রিক ভাবে বৈচিত্র্যে ফুটে উঠেছে আত্বক্ষরণের সর্বৈব মানচিত্র, তাই শাশ্বত সত্য হয়ে অন্তর্লীণ অনুভূতির অভিঘাতে মর্মরিত।

সুলতানা দিল আফরোজ একজন গৃহিণী। ১৯৬৮ সালের ২০ ডিসেম্বর কক্সবাজার জেলার সদর উপজেলার ঈদগাঁও ইউনিয়নের মাইজপাড়া গ্রামে তাঁর জন্ম। পিতা জনাব জামাল আহমেদ পেশায় একজন কৃষিবিদ। তিনি বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়নের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। মাতা হাবিবুন নাহার একজন গৃহিণী। তিন ভাইবোনদের মধ্যে তিনি সবার বড়। পিতার বদলিযোগ্য চাকরির সুবাদে শৈশবে বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে ঘুরে বেড়িয়েছেন, আহরণ করেছেন প্রকৃতির নিবিড় পাঠ, দিগন্তের আভা আর মানুষের বুনিয়াদি আঁকর। কৈশোরে চলে আসেন বার আউলিয়ার দেশ চট্রগ্রামে। পড়ালেখা করেন চট্রগ্রাম গভর্নমেন্ট গার্লস কলেজে। ১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা জনাব এস এম আশরাফুল ইসলামের সাথে বিবাহে আবদ্ধ হন। আবার শুরু হয় ছাপান্ন হাজার বর্গমাইল চষে বেড়ানো আর বাস্তবতার ঘোর ঠেলে খুঁজে ফেরা চরাচরব্যাপী সন্মোহনী প্রাকৃতিক বিলোড়ন। লেখিকার এক কন্যা, এক পুত্রসন্তান এবং স্বামীকে নিয়ে তাঁর গেরস্থলী।

লেখিকার অপূর্ব অনুরাগ মাখা স্বপ্নময় নানারবাড়ীর স্মৃতিচারণ, অতৃপ্ত আবেগে দাদারবাড়ীর রক্তে রাঙা রূপসী বাংলা,প্রিয় বাবার সঙ্গে নিবিড় সান্নিধ্য যা পাঠক পাবে খন্ড় খন্ড় স্মৃতিচারণের ভেতরে অখন্ড় আখ্যানের চমকপ্রদ স্বাদ। আছে ব্যাক্তির জীবন, রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের মানুষ ও সমাজ বাস্তবতার টুকরো উপলব্দি। জীবনের প্রয়োজনে আমরা এগিয়ে যাই সামনে কিন্তু হারানো অতীত স্মৃতিগুলো মনের কোণে ফিরে আসে বারবার, সেই অদম্য স্মৃতিরা এক সময় মিছিল করতে করতে পত্রপল্লবে বিস্তৃতি হয়ে জন্ম নেয় একেকটি গ্রন্থ। যার প্রতিফলন লেখিকা সুলতানা দিল আফরোজের অন্তর্লোক থেকে উৎসারিত ‘আমার শৈশব,আমার বাবাবেলা’ ও ‘স্মৃতির আঙ্গিনায়’।

তাছাড়াও গ্রন্থের গোপনে যতনে আছে- চারপাশের বাস্তবতার এই প্রতিরূপায়নের মাধ্যমে প্রকৃতপক্ষে প্রতিদিনের চেনা দৃশ্যকে চোখের সামনে তুলে ধরে লেখিকা আমাদের তথাকথিত প্রগতিশীলতার মুখোশের অন্তরালে যে সমাজতান্ত্রিক ব্যাক্তিমানুষের বসবাস তাকে চপেটাঘাত করেছেন। প্রতিটি পর্বে দেখতে পাই স্বচ্ছতা, স্পস্টতা রূপায়নের ফলেই আমরা পেয়ে যাই লেখিকার ধ্যানের সমস্ত আয়োজন। যা পাঠকদের মুগ্ধচৈতন্যে গুঞ্জন তুলবে অহর্নিশ।

বাংলাদেশে লেখকের লেখায় সে প্রসিদ্ধ কালোত্তরে আরও চর্চিত যেমন হবে তেমনি নতুন পাঠকও তৈরিতে সক্ষম হবে। আমাদের এ যুগের ভাবচিন্তায় তিনি সন্ত, হৃদ্য। গ্রন্থ দুটির বহুল প্রচার ও প্রসার কামনা করছি।

লেখক-

কবি ও প্রাবন্ধিক নাসের ভূট্টো।

Spread the love

পাঠক আপনার মতামত দিন