বিশুদ্ধতম কবি আসিফ নূর ও “কবিতা সংগ্রহ” — নাসের ভূট্টো

নাসের ভুট্টো, কবি ও প্রাবন্ধিক; কবি আসিফ নূরের কাব্যমানসের বৈশিষ্ট্য সমকালিন কাব্যসতীর্থ থেকে পৃথক। আধুনিক কবির রোমান্টিক গীতিধর্মিতার চেয়ে মহা কাব্যিক ক্লাসিক ধৈর্য তাঁর মানস গঠনে বৈশিষ্টতা দিয়েছে। তাই প্রতিটি গ্রন্থের জন্য একটি পৃথক এবং সামগ্রিক চেতনা ধারণে আধুনিক বাংলা কাব্য পরিত্যাগ করেছিলো, আসিফ তা পুর্নবিবেচনা করেছেন। আসিফ নূর কবিতা মৌল প্রবণতা তাঁর ইতিহাস চেতনা মহাকালের ইশারা থেকে উৎসারিত যে সমাজ সময়চেতনা যে সময়ের মধ্যে সংস্থাপিত মানুষের জৈবিক অস্তিত্ব এবং পরিণতি লিপিবদ্ধ করা। আসিফ যে কারণে আলাদা সেটি হল- এ জনপদের আদিম রূপটি কবিতার সাহায্যে তিনিই ফুটিয়ে তুলেছেন। যে জনপদের ভয়াল শ্বাপদ রূপের পাশাপাশি সম্ভাবনাও তিনি আবিষ্কার করেছেন। চিত্রের যে দিকটা আবিষ্কার করেছিলেন এস, এম সুলতান।আসিফ তার কবিতায় সেই কাজটি করেছেন। সুলতানের চিত্রকলায় আমরা পাই, কৃষি নির্ভর সমাজের পেশীকূল মানুষ সেই মানুষের সংগ্রামশীলতা। আসিফের কবিতা পড়ুয়ার পাঠ- অভিজ্ঞতাকে মাঝে মাঝে অতিক্রম করে যেতে চায়। আসিফ বৈচিত্র্যময় তার একটি গ্রন্থ থেকে আরেকটি গ্রন্থ সৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে আলাদা হয়ে যায়। যদিও পরিণামের একই লক্ষ্যে তার অভিজ্ঞতাকে আসিফের কাব্যগ্রন্থের নাম বিবেচনায় সে সত্য ধরা পড়ে। আসিফের কবিতার আদিম বাঙালিয়ানা লক্ষ্য করা গেলেও তাঁর হাহাকার তাঁর কাছে বর্তমানের মূল্য সর্বাধিক কারণ তার মধ্যে রয়েছে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি। আসিফ নুরের কাছে অতীতের যে মূল্য তা ইতিহাসের ধাম্ভিকতার মধ্যে রয়েছে। আসিফ মানুষের ক্রমিক উন্নতির সম্ভাবনায় আস্থাশীল। কবিকে হতে হবে বর্তমানের প্রতি দায়িত্ববান এবং ভবিষ্যতের দ্রষ্টা।
কবি আসিফ নূরের ‘কবিতা সংগ্রহ’ বইটির প্রচ্ছদ করেছেন শিশুসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষ। বইটি প্রকাশ করেছেন ‘ভাষাপ্রকাশ’। বইটি পাওয়া যাচ্ছে মহান একুশে বইমেলা-২৪। আসিফ নূর বিগত কুড়ি শতকের নব্বই দশকে আবির্ভূত অন্যতম ধীমান কবি। লেখনীর মাধ্যমে সমৃদ্ধ করেছেন ভিন্নধারা। কবি, রম্যোপন্যাস, অনুবাদক ও সম্পাদক। তাঁর লেখার পরিমাণ বিপুল। মানুষের ভালোবাসা ছাড়াও কবি হিসেবে অর্জন করেছেন শেখ হাসিনা বইমেলা সম্মাননা ২০২৩, দরিয়ানগর আন্তর্জাতিক কবিতামেলা সম্মাননা ২০২২, ভারত- বাংলাদেশ মৈত্রী সংসদ সম্মাননা ২০২২, শ্রুতি সম্মাননা ২০১৮, হুদা মেলা সম্মাননা ২০১২ এবং মূল্যায়ন সম্মাননা ২০১১। ভাষা বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য এবং কাব্য দর্শনের নানা পরিবর্তনের কাল পরিসর ধরে ব্যক্তিগত ও একই সঙ্গে কবি কেমন করে শুদ্ধতম হয়ে উঠলে তার ব্যাখ্যা-উদ্ধৃতি সহযোগে না দিলে মুখোশের অন্তরালে আসল রূপটা চেনা বড় দায়। আসিফ নুর তার অনেক কবিতাই জটিল বিষ্ময়কর হলেও পদ্ধতি নির্মাণের কারুকার্য দেখে আমরা অবাক না হয়ে পারি না। তার কবিতার দ্বন্দ্ব, সংঘাত, বৈপরীত্য জটিলতা আমাদের আরও উৎসুক ও আগ্রহী করে তুলে তার কবিতায়।আসিফ নূরের ‘কবিতা সংগ্রহ’ কাব্যগ্রন্থের ‘ সমুদ্র দর্শন’ কবিতাটি একবার পড়তে চাই-

‘সমুদ্র আমাকে ডাকে।
দূরতমা কোনো এক সুরের মতোন,
দূরতমা কোনো এক নারীর মতোন,
ঘুমের গভীরে এসে সমুদ্র আমাকে ডাকে: আয় আয় আয়।’
সহজ সরল উক্তি, বোধশক্তি বিশাল। তার সময়ের কবিদের মধ্যে তিনি অন্যতম কবি, যিনি তৈরি করতে পেরেছেন। প্রকৃতি ও জীবনের অসীম সৌন্দর্যের মাঝে মানুষের দুঃখ বেদনাকে মায়া দিয়ে প্রকাশ করেছেন এক নতুন ভঙ্গিতে, ভিন্ন চেতনায়। জীবনের দুঃখ বেদনাকে তুলে ধরেছেন কারুশিল্পীর শিল্পের ছোঁয়ায়। তার বাক্য চেতনা ও ভাবাবেগ রবীন্দ্র উত্তর সাহিত্যাকাশে নব ঘুরে ভেসে আসে আমাদের কাছে। আসিফ নূর সাহিত্যের উত্তরাধিকারের দায়িত্ববোধ থেকেই তৈরি করেছেন তার কবিতার শিল্পভাবনা। তিনি নিবিড় নীরব পথে নির্জনতায় খুঁজেছেন কবিতার পথঘাট। মানুষ ছাড়াও বিশুদ্ধ প্রকৃতি ও সমুদ্র গর্জন, সীমার মাঝে অসিমের বিচরণ ও লালকাঁকড়ার বর্ণনায় নির্মাণ কৌশল সাধারণ বিষয়কে অসাধারণ করে তুলে ধরেছেন তার কবিতাসমূহ। তাই তিঁনি অকপটে স্বীকার করেন ‘সাম্পানমাঝির গান’ কবিতায়:
‘ বারে বারে ঘর ভাঙে,
বারে বারে বাঁধি ঘর।’
আসিফ নুরের কবিতায় চিত্র রূপময়তা এতটাই স্পষ্ট যে , শব্দ মাত্রই ভেসে উঠে প্রতিটি দিন রাতের শোকের মাস। কবি ব্যক্তি জীবনে নানাবিধ হতাশা, দুঃখ কষ্ট এবং অমানবিক দুনিয়ার এক প্রতিকূল পরিবেশের শিকার বলেই জীবনের ফেলে আসা স্মৃতিগুলো অনুভব করেছেন মানুষের মন এবং সময় অনুবাদ করে। বেরিয়ে এসেছেন মানুষের শ্বাশত ছায়া। কবির কবিতায় কিছু প্রস্তাবনা লক্ষ্য করা যায়। প্রেম, বিরহ, নষ্টালজিয়া থাকলেও কবি তাতে কাতর নন, কবি তার অতীতকে ফিরে আসতে আহ্বান জানান তারপর অতীত আর বর্তমানের তফাৎ মহাকাল চেতনার একাকার করে ফেলেন- ‘ক্ষয়’ কবিতায়। প্রথম দুটি লাইন বেশ লাগে।
‘ লোহা আর চুম্বক এখন
বড় বেশি দূরে দূরে থাকে।’
উপরোল্লেখিত কবিতায় কবি’র কাছে গন্ধমের লাবণ্য চুম্বন দিলে আরো আক্রান্ত হয় বৈশাখী ঝড়। অন্ধকার ঝরে… মধ্য দুপুরে। ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আগন্তুক প্রতিক্ষার পাখি। তিনি অঞ্জলি দেন সর্বদা বাস্তবতার পায়ে। আদি থেকে ভালোবাসে সত্যের দানা। তাই বলে নুরের কবিতায় হতাশা নেই, দুর্দশা নেই তা নয় এক বিন্দু ঐশ্বরিক আলোর জন্য অথবা পাহাড় ডিঙ্গিয়ে নেমে আসা খরস্রোত নদীর কাছে একটু বিরল জলের জন্য চাতক পাখির মতো করে তার পৃথিবী দেখতে গিয়ে বারবার বোধের ধূলোতে আটকে ফেলে জীবনের সব শুদ্ধতা। এভাবে বিশুদ্ধ হয়ে ওঠে আসিফ নুরের কবিতা। আসিফের কবিতা অনেকাংশ সরল, আধুনিক জটিলতা যা এসেছে তা সরলতাকে অবগাহন করতে যেয়ে। কবি আসিফ নূরের কাব্য সংগ্রহের ‘অবাক মতবিনিময় সভা’ কবিতাটি বারবার আমার বুকের ভিতরে অহর্নিশ ডাক পাড়ে। ‘মতবিনিময় সভাশেষে জমেছে দারুণ মতবিনিময়- বিজ্ঞ বক্তাগণ, যারা এতক্ষণ সেমিনারমঞ্চে পরস্পরে
বিপরীত বক্তব্যের খৈ ফুটিয়েছেন মাইক্রোফোনের ঠোঁটে, এখন সবার ভাব গলায় একই মদের নেশায়
দ্বিমত- ত্রিমত সব মত ভেসে গেছে রঙ্গরসের বন্যায়।’
কবি আসিফ নূর তাঁর নিজস্ব রাজধানীর সঙ্গে গভীর বিজড়িত থাকেন এবং প্রত্যেক সৃষ্টিকর্মেই তার নিজস্ব নগরের একটা বিশেষ রূপ ধরা পড়ে যা স্বতন্ত্র্য প্রতিস্বিকতায় অতুলনীয়। প্রত্যেক কবিতারই থাকে একটা নিজস্ব চরিত্র, স্বতন্ত্র্য, জলবায়ু, আলাদা বৈশিষ্ট্য, চাল-চলন, যানবাহন, স্বতন্ত্র্য ভূগোলের অবকাঠামোময় কবিতার চালচিত্র তার আত্মার এ স্বরূপ আমরা চিত্রিত দেখি, তার সমকালিন কবিদের কাব্যকথায়, সবুজ সময়ে কবি বাঁচতে চান। তিনি এক মন্ত্রে বিশ্বাসী নয়, কবি বারেবারে নবপ্রাণের নব নন্দনের সন্ধানী। সন্ধান করেন মানুষের ভেতরের মানুষটিকে। আলাদা করেন মুখ ও মুখোশ। পুরাকাল, সমকাল আর ভাবিকাল- সকল কালের আকাশ মিলেমিশে যে একটা আলাদা ও ইশারামন্ড়িত মায়াডোর নির্মাণ করতে পারে, এ তাঁর কবিতার চলনে- বলনে মূর্ত হতে চায়, চারিত হতে চায় পাঠকের বোধেও। মত থেকে মতামত তারপর সুন্দর একটি পথ, যে পথে সমর্পিত সত্যের নিবিড় ধ্বনি এনে দেবে তাবৎ মানুষের কল্যাণ ও মূল্যায়ন। অথচ মতবিনিময়ে মদ বিনিময় সবার দৃষ্টিতে ধরা না পড়লেও কবির চোখ যেন প্রকৃতির অবারিত উপলব্ধি। তাই কবি বিশ্বমানুষের ভাষা বুঝেন। পৃথিবীর সিলেবাসের দিকে খেয়াল করেই অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন। বিচিত্র চেতনার কবি রূপ দেখেছেন নিজের ভেতর, অনুভব করেছেন ভেতরের একজন। যে নতুন যাত্রা আমরা কেবল শুদ্ধতম কবি আসিফ নূরের কাছ থেকে আশা করতে পারি। তাই তিঁনি অকপটে স্বীকার করেন:’বাউলিয়ানা’ কবিতায়-

‘বাউলের নাম নদী আর
একতারার নাম স্রোত, তার
ফেনিল গানের নাম ঢেউ।’
কবিতার রং রস আর রূপ আর রূপ যেন নিবিড় ভাবে মিশে আছে এই কবি শিল্পীর সত্তায় তার কবিতার সমুদ্রের ঢেউ হয়ে যেন দৌড়ে বেড়ায় বঙ্গোপসাগর থেকে দূরের কোন সাগরে। অন্য জগতে যে জগতে আমরা প্রতিটি মানুষ যাপন করছি।
আমাদের সময়ে বহুমাত্রিক আলোক মানুষ কবি আসিফ নূর। এই কবিতার কাব্য প্রয়াসের কেন্দ্রে রয়েছে ব্যক্তি মানুষ, জাতিমানুষ ও বিশ্ব মানুষের সমীকৃত প্রতীতি। এই বাঙালি কবি সমকালিন বিশ্ব কবিতার এক তাৎপর্যপূর্ণ কারুকৃত।
কবিতার পাঠক এখন কবিরাই। এমন আন্দোলিত, শিহরিত ঘুরের রেশ নান্দনিক বিভায় অমোঘ আনন্দ পাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে কবিতাকে বিশেষ প্রেমের প্রণোদনায় গ্রহণ পূর্বক পাঠকের হাতে তুলে দেওয়া একমাত্র কবি আসিফ নূরের সম্ভব। তার কবিতায় প্রেম- অপ্রেমে, আশা-নিরাশা, বিনয় ঔদ্ধত্যÑঘুম জাগরনের নানান অনুষঙ্গে বহুমাত্রিক দ্যোতনা তৈরি করে, সৃষ্টি করে ব্যঞ্জনাময় আলো আঁধারি।
মহৎ কবি তার কবিতার শিল্পায়ন প্রক্রিয়ার দ্বারা কবিতার এমন বিনোদন তৈরি করেন- বিহ্বলে, আনন্দে আমরা দায়গ্রস্ত হয়ে পড়ি। এই মর্মভেদী ভালোলাগা থেকে ঘরে আসার উপায় থাকে না। আশি দশকের শক্তিমান কবি আসিফ নূর সেই দায় চাপিয়েছেন আমাদের মনের ওপর। তার অবচেতনা, বিপন্নতা, অন্ধকার, নির্জনতা, ইতিহাস চেতনা, জাগতিক বিপরীতে অভিমান সূচক ঘুম দ্বারা আমরা আক্রান্ত, হচ্ছি এখনো। এর মধ্যে নতুন কোনো ঘুমের অনুভূতি আমাদের নিরলসভাবে আবেশ লাগিয়ে দেওয়ার বিশেষভাবে এই মহৎ কবির ঝুড়ি নেই বাংলার সাহিত্য আকাশে।
কবির ‘উপকূলগাথা’ শিরেনামের কবিতার শেষের দুটি লাইন বেশ ভালো লেগেছে-
‘মাঝিবউ অস্হিরমাত-
কখন ফিরবে প্রাণনাথ’
অসাধারণ কাব্য প্রণয়। মহাজাগতিক প্রলোভনের মতো চমক লাগিয়ে দেয়, ইঙ্গিত আছে। পাঠককে ঘুম পাড়িয়ে দেয় না সচকিত করে জাগিয়ে দেয়। যেন অর্থহীন ফ্যান্টাসির জগতের ঘুমের একটা বহুরূপ ছবি অভিজ্ঞান তৈরি করে পাঠকের।
কবি তৈরি করেছেন এসবারড়িটি এর অভ্যন্তরে সংকল্প নেই আছে স্বপ্ন, অভিনবত্বটুকু কবিতার প্রাণ এই অভিনবত্বের জন্যই একই বিষয়ে বিভিন্ন কবির কবিতা ভিন্ন ভিন্ন প্রক্ষেপন গ্রাহ্য করতে হলে পাঠককে অবশ্যই কবিতাপ্রেমিক হওয়া প্রয়োজন। প্রেম আমাদের সর্বময় অভিযোজনের ক্ষমতা দেয়। ভালোমন্দের প্রভেদ তৈরি করাও প্রত্যেকটি কবিতা থেকে স্বতন্ত্র্য আস্বাদ গ্রহণের জন্য বিশেষ ছাঁচে গঠন করে দেয় আমাদের মনকে। যদিও বিষয় হিসেবে প্রেম এ সময়ের কবিতা থেকে নির্বাসিত প্রায়। কিন্তু আমাদের কবি আসিফ নূর সবার জন্য তুলে ধরেছেন প্রতিভার চিরন্তন মৌলিকতা, অর্ন্তভেদী উৎকর্ষ নিঃসন্দেহে কবিকে অভিভূত ও দ্রুবিভূত করেছিলেন বলেই শিরদাঁড়া সোজা করে মানবীয় ঋতুতার দুর্বিনীতি অহংকারে সচলায়তনের প্রণোদনা যোগায় কবির প্রতিটি উচ্চারণ। জয়তু বিশুদ্ধতম কবি আসিফ নূর।

বিশুদ্ধতম কবি আসিফ নূর ও “কবিতা সংগ্রহ” — নাসের ভূট্টো

নাসের ভুট্টো;

কবি আসিফ নূরের কাব্যমানসের বৈশিষ্ট্য সমকালিন কাব্যসতীর্থ থেকে পৃথক। আধুনিক কবির রোমান্টিক গীতিধর্মিতার চেয়ে মহা কাব্যিক ক্লাসিক ধৈর্য তাঁর মানস গঠনে বৈশিষ্টতা দিয়েছে। তাই প্রতিটি গ্রন্থের জন্য একটি পৃথক এবং সামগ্রিক চেতনা ধারণে আধুনিক বাংলা কাব্য পরিত্যাগ করেছিলো, আসিফ তা পুর্নবিবেচনা করেছেন। আসিফ নূর কবিতা মৌল প্রবণতা তাঁর ইতিহাস চেতনা মহাকালের ইশারা থেকে উৎসারিত যে সমাজ সময়চেতনা যে সময়ের মধ্যে সংস্থাপিত মানুষের জৈবিক অস্তিত্ব এবং পরিণতি লিপিবদ্ধ করা। আসিফ যে কারণে আলাদা সেটি হল- এ জনপদের আদিম রূপটি কবিতার সাহায্যে তিনিই ফুটিয়ে তুলেছেন। যে জনপদের ভয়াল শ্বাপদ রূপের পাশাপাশি সম্ভাবনাও তিনি আবিষ্কার করেছেন। চিত্রের যে দিকটা আবিষ্কার করেছিলেন এস, এম সুলতান।আসিফ তার কবিতায় সেই কাজটি করেছেন। সুলতানের চিত্রকলায় আমরা পাই, কৃষি নির্ভর সমাজের পেশীকূল মানুষ সেই মানুষের সংগ্রামশীলতা। আসিফের কবিতা পড়ুয়ার পাঠ- অভিজ্ঞতাকে মাঝে মাঝে অতিক্রম করে যেতে চায়। আসিফ বৈচিত্র্যময় তার একটি গ্রন্থ থেকে আরেকটি গ্রন্থ সৃষ্টিগ্রাহ্যভাবে আলাদা হয়ে যায়। যদিও পরিণামের একই লক্ষ্যে তার অভিজ্ঞতাকে আসিফের কাব্যগ্রন্থের নাম বিবেচনায় সে সত্য ধরা পড়ে।
আসিফের কবিতার আদিম বাঙালিয়ানা লক্ষ্য করা গেলেও তাঁর হাহাকার তাঁর কাছে বর্তমানের মূল্য সর্বাধিক কারণ তার মধ্যে রয়েছে ভবিষ্যৎ নির্মাণের প্রতিশ্রুতি। আসিফ নুরের কাছে অতীতের যে মূল্য তা ইতিহাসের ধাম্ভিকতার মধ্যে রয়েছে। আসিফ মানুষের ক্রমিক উন্নতির সম্ভাবনায় আস্থাশীল। কবিকে হতে হবে বর্তমানের প্রতি দায়িত্ববান এবং ভবিষ্যতের দ্রষ্টা।
কবি আসিফ নূরের ‘কবিতা সংগ্রহ’ বইটির প্রচ্ছদ করেছেন শিশুসাহিত্যে বাংলা একাডেমি পুরস্কারপ্রাপ্ত বিশিষ্ট প্রচ্ছদশিল্পী ধ্রুব এষ। বইটি প্রকাশ করেছেন ‘ভাষাপ্রকাশ’। বইটি পাওয়া যাচ্ছে মহান একুশে বইমেলা-২৪।
আসিফ নূর বিগত কুড়ি শতকের নব্বই দশকে আবির্ভূত অন্যতম ধীমান কবি। লেখনীর মাধ্যমে সমৃদ্ধ করেছেন ভিন্নধারা। কবি, রম্যোপন্যাস, অনুবাদক ও সম্পাদক। তাঁর লেখার পরিমাণ বিপুল। মানুষের ভালোবাসা ছাড়াও কবি হিসেবে অর্জন করেছেন শেখ হাসিনা বইমেলা সম্মাননা ২০২৩, দরিয়ানগর আন্তর্জাতিক কবিতামেলা সম্মাননা ২০২২, ভারত- বাংলাদেশ মৈত্রী সংসদ সম্মাননা ২০২২, শ্রুতি সম্মাননা ২০১৮, হুদা মেলা সম্মাননা ২০১২ এবং মূল্যায়ন সম্মাননা ২০১১।

ভাষা বিষয়বস্তুর বৈচিত্র্য এবং কাব্য দর্শনের নানা পরিবর্তনের কাল পরিসর ধরে ব্যক্তিগত ও একই সঙ্গে কবি কেমন করে শুদ্ধতম হয়ে উঠলে তার ব্যাখ্যা-উদ্ধৃতি সহযোগে না দিলে মুখোশের অন্তরালে আসল রূপটা চেনা বড় দায়। আসিফ নুর তার অনেক কবিতাই জটিল বিষ্ময়কর হলেও পদ্ধতি নির্মাণের কারুকার্য দেখে আমরা অবাক না হয়ে পারি না। তার কবিতার দ্বন্দ্ব, সংঘাত, বৈপরীত্য জটিলতা আমাদের আরও উৎসুক ও আগ্রহী করে তুলে তার কবিতায়।
আসিফ নূরের ‘কবিতা সংগ্রহ’ কাব্যগ্রন্থের ‘ সমুদ্র দর্শন’ কবিতাটি একবার পড়তে চাই-
‘সমুদ্র আমাকে ডাকে।
দূরতমা কোনো এক সুরের মতোন,
দূরতমা কোনো এক নারীর মতোন,
ঘুমের গভীরে এসে সমুদ্র আমাকে ডাকে: আয় আয় আয়।’
সহজ সরল উক্তি, বোধশক্তি বিশাল। তার সময়ের কবিদের মধ্যে তিনি অন্যতম কবি, যিনি তৈরি করতে পেরেছেন। প্রকৃতি ও জীবনের অসীম সৌন্দর্যের মাঝে মানুষের দুঃখ বেদনাকে মায়া দিয়ে প্রকাশ করেছেন এক নতুন ভঙ্গিতে, ভিন্ন চেতনায়। জীবনের দুঃখ বেদনাকে তুলে ধরেছেন কারুশিল্পীর শিল্পের ছোঁয়ায়। তার বাক্য চেতনা ও ভাবাবেগ রবীন্দ্র উত্তর সাহিত্যাকাশে নব ঘুরে ভেসে আসে আমাদের কাছে। আসিফ নূর সাহিত্যের উত্তরাধিকারের দায়িত্ববোধ থেকেই তৈরি করেছেন তার কবিতার শিল্পভাবনা। তিনি নিবিড় নীরব পথে নির্জনতায় খুঁজেছেন কবিতার পথঘাট। মানুষ ছাড়াও বিশুদ্ধ প্রকৃতি ও সমুদ্র গর্জন, সীমার মাঝে অসিমের বিচরণ ও লালকাঁকড়ার বর্ণনায় নির্মাণ কৌশল সাধারণ বিষয়কে অসাধারণ করে তুলে ধরেছেন তার কবিতাসমূহ। তাই তিঁনি অকপটে স্বীকার করেন ‘সাম্পানমাঝির গান’ কবিতায়:
‘ বারে বারে ঘর ভাঙে,
বারে বারে বাঁধি ঘর।’
আসিফ নুরের কবিতায় চিত্র রূপময়তা এতটাই স্পষ্ট যে , শব্দ মাত্রই ভেসে উঠে প্রতিটি দিন রাতের শোকের মাস। কবি ব্যক্তি জীবনে নানাবিধ হতাশা, দুঃখ কষ্ট এবং অমানবিক দুনিয়ার এক প্রতিকূল পরিবেশের শিকার বলেই জীবনের ফেলে আসা স্মৃতিগুলো অনুভব করেছেন মানুষের মন এবং সময় অনুবাদ করে। বেরিয়ে এসেছেন মানুষের শ্বাশত ছায়া। কবির কবিতায় কিছু প্রস্তাবনা লক্ষ্য করা যায়। প্রেম, বিরহ, নষ্টালজিয়া থাকলেও কবি তাতে কাতর নন, কবি তার অতীতকে ফিরে আসতে আহ্বান জানান তারপর অতীত আর বর্তমানের তফাৎ মহাকাল চেতনার একাকার করে ফেলেন- ‘ক্ষয়’ কবিতায়। প্রথম দুটি লাইন বেশ লাগে।
‘ লোহা আর চুম্বক এখন
বড় বেশি দূরে দূরে থাকে।’
উপরোল্লেখিত কবিতায় কবি’র কাছে গন্ধমের লাবণ্য চুম্বন দিলে আরো আক্রান্ত হয় বৈশাখী ঝড়। অন্ধকার ঝরে… মধ্য দুপুরে। ঝাঁকে ঝাঁকে উড়ে আগন্তুক প্রতিক্ষার পাখি। তিনি অঞ্জলি দেন সর্বদা বাস্তবতার পায়ে। আদি থেকে ভালোবাসে সত্যের দানা। তাই বলে নুরের কবিতায় হতাশা নেই, দুর্দশা নেই তা নয় এক বিন্দু ঐশ্বরিক আলোর জন্য অথবা পাহাড় ডিঙ্গিয়ে নেমে আসা খরস্রোত নদীর কাছে একটু বিরল জলের জন্য চাতক পাখির মতো করে তার পৃথিবী দেখতে গিয়ে বারবার বোধের ধূলোতে আটকে ফেলে জীবনের সব শুদ্ধতা। এভাবে বিশুদ্ধ হয়ে ওঠে আসিফ নুরের কবিতা। আসিফের কবিতা অনেকাংশ সরল, আধুনিক জটিলতা যা এসেছে তা সরলতাকে অবগাহন করতে যেয়ে।
কবি আসিফ নূরের কাব্য সংগ্রহের ‘অবাক মতবিনিময় সভা’ কবিতাটি বারবার আমার বুকের ভিতরে অহর্নিশ ডাক পাড়ে।
‘মতবিনিময় সভাশেষে জমেছে দারুণ মদবিনিময়-
বিজ্ঞ বক্তাগণ, যারা এতক্ষণ সেমিনারমঞ্চে পরস্পরে
বিপরীত বক্তব্যের খৈ ফুটিয়েছেন মাইক্রোফোনের ঠোঁটে,
এখন সবার ভাব গলায় একই মদের নেশায়
দ্বিমত- ত্রিমত সব মত ভেসে গেছে রঙ্গরসের বন্যায়।’
কবি আসিফ নূর তাঁর নিজস্ব রাজধানীর সঙ্গে গভীর বিজড়িত থাকেন এবং প্রত্যেক সৃষ্টিকর্মেই তার নিজস্ব নগরের একটা বিশেষ রূপ ধরা পড়ে যা স্বতন্ত্র্য প্রতিস্বিকতায় অতুলনীয়। প্রত্যেক কবিতারই থাকে একটা নিজস্ব চরিত্র, স্বতন্ত্র্য, জলবায়ু, আলাদা বৈশিষ্ট্য, চাল-চলন, যানবাহন, স্বতন্ত্র্য ভূগোলের অবকাঠামোময় কবিতার চালচিত্র তার আত্মার এ স্বরূপ আমরা চিত্রিত দেখি, তার সমকালিন কবিদের কাব্যকথায়, সবুজ সময়ে কবি বাঁচতে চান। তিনি এক মন্ত্রে বিশ্বাসী নয়, কবি বারেবারে নবপ্রাণের নব নন্দনের সন্ধানী। সন্ধান করেন মানুষের ভেতরের মানুষটিকে। আলাদা করেন মুখ ও মুখোশ। পুরাকাল, সমকাল আর ভাবিকাল- সকল কালের আকাশ মিলেমিশে যে একটা আলাদা ও ইশারামন্ড়িত মায়াডোর নির্মাণ করতে পারে, এ তাঁর কবিতার চলনে- বলনে মূর্ত হতে চায়, চারিত হতে চায় পাঠকের বোধেও। মত থেকে মতামত তারপর সুন্দর একটি পথ, যে পথে সমর্পিত সত্যের নিবিড় ধ্বনি এনে দেবে তাবৎ মানুষের কল্যাণ ও মূল্যায়ন। অথচ মতবিনিময়ে মদ বিনিময় সবার দৃষ্টিতে ধরা না পড়লেও কবির চোখ যেন প্রকৃতির অবারিত উপলব্ধি। তাই কবি বিশ্বমানুষের ভাষা বুঝেন। পৃথিবীর সিলেবাসের দিকে খেয়াল করেই অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করেন।

বিচিত্র চেতনার কবি রূপ দেখেছেন নিজের ভেতর, অনুভব করেছেন ভেতরের একজন। যে নতুন যাত্রা আমরা কেবল শুদ্ধতম কবি আসিফ নূরের কাছ থেকে আশা করতে পারি।
তাই তিঁনি অকপটে স্বীকার করেন:’বাউলিয়ানা’ কবিতায়-
‘বাউলের নাম নদী আর
একতারার নাম স্রোত, তার
ফেনিল গানের নাম ঢেউ।’
কবিতার রং রস আর রূপ আর রূপ যেন নিবিড় ভাবে মিশে আছে এই কবি শিল্পীর সত্তায় তার কবিতার সমুদ্রের ঢেউ হয়ে যেন দৌড়ে বেড়ায় বঙ্গোপসাগর থেকে দূরের কোন সাগরে। অন্য জগতে যে জগতে আমরা প্রতিটি মানুষ যাপন করছি।
আমাদের সময়ে বহুমাত্রিক আলোক মানুষ কবি আসিফ নূর। এই কবিতার কাব্য প্রয়াসের কেন্দ্রে রয়েছে ব্যক্তি মানুষ, জাতিমানুষ ও বিশ্ব মানুষের সমীকৃত প্রতীতি। এই বাঙালি কবি সমকালিন বিশ্ব কবিতার এক তাৎপর্যপূর্ণ কারুকৃত।
কবিতার পাঠক এখন কবিরাই। এমন আন্দোলিত, শিহরিত ঘুরের রেশ নান্দনিক বিভায় অমোঘ আনন্দ পাওয়ার ইচ্ছা নিয়ে কবিতাকে বিশেষ প্রেমের প্রণোদনায় গ্রহণ পূর্বক পাঠকের হাতে তুলে দেওয়া একমাত্র কবি আসিফ নূরের সম্ভব। তার কবিতায় প্রেম- অপ্রেমে, আশা-নিরাশা, বিনয় ঔদ্ধত্যÑঘুম জাগরনের নানান অনুষঙ্গে বহুমাত্রিক দ্যোতনা তৈরি করে, সৃষ্টি করে ব্যঞ্জনাময় আলো আঁধারি।
মহৎ কবি তার কবিতার শিল্পায়ন প্রক্রিয়ার দ্বারা কবিতার এমন বিনোদন তৈরি করেন- বিহ্বলে, আনন্দে আমরা দায়গ্রস্ত হয়ে পড়ি। এই মর্মভেদী ভালোলাগা থেকে ঘরে আসার উপায় থাকে না। আশি দশকের শক্তিমান কবি আসিফ নূর সেই দায় চাপিয়েছেন আমাদের মনের ওপর। তার অবচেতনা, বিপন্নতা, অন্ধকার, নির্জনতা, ইতিহাস চেতনা, জাগতিক বিপরীতে অভিমান সূচক ঘুম দ্বারা আমরা আক্রান্ত, হচ্ছি এখনো। এর মধ্যে নতুন কোনো ঘুমের অনুভূতি আমাদের নিরলসভাবে আবেশ লাগিয়ে দেওয়ার বিশেষভাবে এই মহৎ কবির ঝুড়ি নেই বাংলার সাহিত্য আকাশে।
কবির ‘উপকূলগাথা’ শিরেনামের কবিতার শেষের দুটি লাইন বেশ ভালো লেগেছে-
‘মাঝিবউ অস্হিরমাত-
কখন ফিরবে প্রাণনাথ’
অসাধারণ কাব্য প্রণয়। মহাজাগতিক প্রলোভনের মতো চমক লাগিয়ে দেয়, ইঙ্গিত আছে। পাঠককে ঘুম পাড়িয়ে দেয় না সচকিত করে জাগিয়ে দেয়। যেন অর্থহীন ফ্যান্টাসির জগতের ঘুমের একটা বহুরূপ ছবি অভিজ্ঞান তৈরি করে পাঠকের।
কবি তৈরি করেছেন এসবারড়িটি এর অভ্যন্তরে সংকল্প নেই আছে স্বপ্ন, অভিনবত্বটুকু কবিতার প্রাণ এই অভিনবত্বের জন্যই একই বিষয়ে বিভিন্ন কবির কবিতা ভিন্ন ভিন্ন প্রক্ষেপন গ্রাহ্য করতে হলে পাঠককে অবশ্যই কবিতাপ্রেমিক হওয়া প্রয়োজন। প্রেম আমাদের সর্বময় অভিযোজনের ক্ষমতা দেয়। ভালোমন্দের প্রভেদ তৈরি করাও প্রত্যেকটি কবিতা থেকে স্বতন্ত্র্য আস্বাদ গ্রহণের জন্য বিশেষ ছাঁচে গঠন করে দেয় আমাদের মনকে। যদিও বিষয় হিসেবে প্রেম এ সময়ের কবিতা থেকে নির্বাসিত প্রায়। কিন্তু আমাদের কবি আসিফ নূর সবার জন্য তুলে ধরেছেন প্রতিভার চিরন্তন মৌলিকতা, অর্ন্তভেদী উৎকর্ষ নিঃসন্দেহে কবিকে অভিভূত ও দ্রুবিভূত করেছিলেন বলেই শিরদাঁড়া সোজা করে মানবীয় ঋতুতার দুর্বিনীতি অহংকারে সচলায়তনের প্রণোদনা যোগায় কবির প্রতিটি উচ্চারণ। জয়তু বিশুদ্ধতম কবি আসিফ নূর।

 

 

 

 

কবি নাসের ভূট্টো 

কবি ও প্রান্ধিক
২৯ ফেব্রুয়ারী ২০২৪, কক্সবাজার।

কবি নাসের ভূট্টো’র এক ঝাঁক বইয়ের ঝাঁকুনিতে “ধর্মান্ধের কবলে কবি” এবারের একুশে বইমেলা- ২৪

কবি নাসের ভূট্টো’র এক ঝাঁক বইয়ের ঝাঁকুনিতে “ধর্মান্ধের কবলে কবি” এবারের একুশে বইমেলা- ২৪।

সৃজনশীলতার নিরন্তর পরিব্রাজক কবি নাসের ভূট্টো’র আজন্ম শ্লোগান প্রচলিত সমাজ ও অসুন্দরের বিরুদ্ধে। প্রয়োজনে ভেঙ্গেছে বৈষম্য,প্রথা ও প্রত্যাখান। অবিশ্বাসী ও স্বার্থান্ধদের দখলে যখন পৃথিবী, অধিকাংশ মানুষ যখন প্রথার অলাতচক্রে নিপতিত, যার ফলে ধ্বংস হচ্ছে প্রতিনিয়ত কবিতা, মানবিকতা ও সভ্যতা। তখন বোধ নয়, বোধাতীত বিস্ময়ে জাগরন ঘটান চারপাশের নিরন্তর শুভকে।
সেই ধারাবাহিকতায় এবারের মহান একুশে বইমেলায় নাসের ভূট্টো’র একাদশ গ্রণ্হ “ধর্মান্ধের কবলে কবি” প্রকাশ পাচ্ছে।
বই- ধর্মান্ধের কবলে কবি
লেখক- নাসের ভূট্টো
ধরন- কবিতার বই
প্রকাশনী- তৃতীয় চোখ
প্রকাশক – আলী প্রয়াস
প্রচ্ছদ – আল নোমান
নাসের ভূট্টো নব্বই দশকের কবি। তিনি কবিতা চাষ করেন জীবন বিকাশের মতো ধীরে ধীরে। তার ভাষা ভিন্ন, গভীর অনুভূতির ছোঁয়ায় যা পংক্তিতে পংক্তিতে আলোড়িত। এবারের বইমেলায় তাঁর এগারটি গ্রণ্হ পাওয়া যাবে তৃতীয় চোখ স্টলে। ঢাকা স্টল নং- ১৪৮, চট্রগ্রাম স্টল নং- ৪৯, ৫০। তাঁর প্রকাশিত গ্রণ্হগুলোর নাম নিম্নে দেওয়া গেলঃ
১. অনিবার্য ধূলো রোজই ওড়ে ( কাব্য, ২০১৬)
২. দীঘিভরা প্রাচীন মেঘ ( কাব্য, ২০১৭)
৩. অন্তঃস্হ স্মৃতির কোঁচড় ( কাব্য, ২০১৮)
৪. ঈশ্বর এবং অন্ধকার সমুদ্র ( কাব্য, ২০১৮)
৫. মফস্বলের একজন বামপন্হী ( উপন্যাস, ২০১৯)
৬. বিনয়াবনত ( কাব্য, ২০১৯)
৭. ক্ষুধার্ত মানুষের উপাখ্যান ( প্রবন্ধ, ২০২০)
৮. সুন্দরের অনন্ত বৈভব ( কাব্য, ২০২১)
৯. কবিতা সমগ্র ( কাব্য, ২০২২)
১০. বামপন্হীর নিরীহ প্রস্তুতিপর্ব ( উপন্যাস ২০২৩)
১১. ধর্মান্ধের কবলে কবি ( কাব্য ২০২৪)
“ধর্মান্ধের কবলে কবি” কাব্যটি সত্য প্রকাশের অঙ্গিকারে যেমন উঠে এসেছে বেদনার জন্মভিটা তেমনি নষ্টালজিক, কু- সংস্কার, বৈশ্বিক ভাবনা, আধ্যাত্মবোধ ও গণমানুষের মুক্তি ছড়িয়ে আছে কবিতার পর কবিতায়। তিঁনি তার কাব্যে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছেন- উত্তাপ স্পর্শে ঘুরে যাওয়া গতিপথ, নির্বাসনের মূল্যে অর্জন করা আত্বশুদ্ধি ও মানুষের বিশ্বাসের অন্তঃসারশূন্যতা।

মহান একুশে বই মেলায় সুলতানা দিল আফরোজের ত্রিরত্ন

“মহান একুশে বই মেলায় সুলতানা দিল আফরোজের ত্রিরত্ন”

সুলতানা দিল আফরোজ,কক্সবাজার জেলার ঈদগাঁও উপজেলার ঈদগাঁও ইউনিয়নের মাইজপাড়া গ্রামের একটি ঐতিহ্যবাহী পরিবারে তাঁর জন্ম। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পূর্বে জন্ম নেওয়া এই লেখকের জন্ম তারিখ ২০শে ডিসেম্বর। পিতা জনাব জামাল আহমেদ পেশায় একজন কৃষিবিদ। মাতা হাবিবুন নাহার একজন গৃহিণী। তিন ভাই বোনের মধ্যে তিনি সবার বড়। পিতার বদলিযোগ্য চাকরির সুবাদে শৈশবে বাংলাদেশের বিভিন্ন জায়গায় ঘুরেছেন। কৈশোরে চলে আসেন চট্টগ্রাম। বাংলাদেশ মহিলা সমিতি স্কুল ও কলেজ এবং চট্টগ্রাম গভর্নমেন্ট গার্লস কলেজে পড়ালেখা করেছেন।১৯৮৮ সালে বাংলাদেশ জনপ্রশাসনের কর্মকর্তা,কর্ণফুলী উপজেলার দৌলতপুর কাজিবাড়ির মরহুম সৈয়দ আমিনুল ইসলাম এবং মরহুমা সৈয়দা নুরজাহান বেগমের মেঝছেলে জনাব এস এম আশরাফুল ইসলামের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। আবার শুরু হয় দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছুটে চলা। এই ছুটে চলায় যুক্ত হয়েছে পৃথিবীর কয়েকটি দেশভ্রমণের অভিজ্ঞতাও। এক কন্যা,এক পুত্র এবং স্বামীকে নিয়ে তাঁর ছোট সংসার।স্বামীর কর্মক্ষেত্রে থাকা এবং ছুটে চলার পথে তিনি কুষ্টিয়ার মিরপুরে একটি নতুন স্কুল প্রতিষ্ঠা এবং পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন। তিনি নিবিড় এবং নিবেদিতপ্রাণ হয়ে সে দায়িত্ব পালন করেন। করোনাকালে জীবনের ব্যস্ততা কিছুটা কমে আসার ফাঁকে তিনি লেখালিখিতে ঝুঁকে পড়েন। তাঁর লিখা তিনটি বই,‘আমার শৈশব আমার বাবা বেলা’(জানুয়ারি ২০২১),‘স্মৃতির আঙিনায়’ (ফেব্রুয়ারি ২০২১),‘ভ্রমণে ভাবনায় সিলেট’(ফেব্রুয়ারি ২০২৩) পাঠক প্রিয়তা অর্জন করেছে।এ ছাড়াও তিনি ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে এবং লিটল ম্যাগাজিনে নিয়মিত লিখে চলেছেন। চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত ত্রৈমাসিক পত্রিকা ‘প্রকৃতির’ তিনি একজন নিয়মিত লেখক। তাঁর লিখা প্রবন্ধগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য (ক)হৃদয়ে মাটি ও ভাষা (খ)প্রসঙ্গ নারী দিবস এবং আমরা (গ)স্মৃতিতে ঈদ এবং ঈদ কড়চা। ধারাবাহিকভাবে ভার্চুয়াল প্ল্যাটফর্মে লিখা হয়েছিল যা পরবর্তীতে বই আকারে প্রকাশ করার একান্ত ইচ্ছা রয়েছে এমন কিছু লিখা হলো_(ক)খাদ্য সংস্কৃতির বিবর্তন বহে ধীর লয়ে (খ)প্রসঙ্গ মির্জা গালিব।বর্তমানে তিনি কাজ করছেন ‘কর্ণফুলীর বাঁকে-পান্থজনের কথকতা’ শিরোনামের একটি বই নিয়ে। আশা করা যায় খুব শীঘ্রই এটি ভিন্ন আঙ্গিকে বই আকারে প্রকাশিত হবে।জাতীয় বইমেলা-২০২৩-এ সিলেট ভ্রমণের উপর তাঁর লিখা বই ‘ভ্রমণে ভাবনায় সিলেট’ প্রকাশিত হয়ে জনপ্রিয় হয়েছে। তাঁর সাবলীল লেখনিতে খুঁজে পাওয়া যায় স্মৃতিচারণ কিংবা ভ্রমণকাহিনি তেমনি দেশপ্রেম,প্রকৃতি,মাটির সোঁদা গন্ধ,ইতিহাস,ঐতিহ্য। নতুন প্রজন্মের সাথে শেকড়ের এক মেলবন্ধন গড়ে তুলতে তাঁর এই ঐকান্তিক প্রচেষ্টা। তাঁর লিখায় বিমূর্ত হয়ে উঠে জীবনের বৃহত্তর ক্যানভাস। শৈশব হতেই তিনি ছিলেন একজন নিবেদিত পাঠক। ধীরে ধীরে এই পাঠাভ্যাস তাঁকে একজন লেখকে রূপান্তর করে।
এবারের মহান একুশে বইমেলা- ২৪ এ কথাসাহিত্যিক সুলতানা দিল আফরোজের সময়ে স্বল্পতার কারনে কোন বই প্রকাশ না পেলেও দেশ পাবলিকেশন স্টল নং ৪৭৮_৪৮০ পাওয়া যাবে লেখকের তিনটি বই।
বইগুলো ছুঁয়ে দেখুন, কথা বলুন, একটু সময় দিন দৃষ্টিজয়ীদের সঙ্গে।

উখিয়া কলেজে নবীনদের বরণ করে নিলেন সভাপতি টিপুর নেতৃত্বে কলেজ ছাত্রলীগ

নিজস্ব প্রতিবেদক:: উখিয়া কলেজ’র একাদশ শ্রেণীর ২০২৩-২৪ইং শিক্ষাবর্ষের নবীন ছাত্র/শিক্ষার্থীদের বরন করে নিলেন দক্ষিণ এশিয়ার সর্ববৃহৎ সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগ উখিয়া কলেজ শাখা।

০৮ অক্টোবর ২০২৩ইং, রবিবার অরিন্টেশন ক্লাসের আগ মুহূর্তে সকল শিক্ষার্থীদের ফুল দিয়ে বরণ করে নেন উখিয়া কলেজ ছাত্রলীগের সভাপতি ও সফল ছাত্রনেতা সাইদুল আমিন টিপুর নেতৃত্বে উখিয়া কলেজ ছাত্রলীগ।

নবাগত শিক্ষার্থীদের বরণকালে আরো উপস্থিত ছিলেন উখিয়া কলেজ ছাত্রলীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক ইসহাক মাহমুদ, কলেজ ছাত্রলীগের ২য় বর্ষের সাবেক সভাপতি মিজানুর রহমান,কলেজ ছাত্রলীগ নেতা, মোহাম্মদ ইসমাইল, সাইফুল,অলি উল্লাহ্, ভুট্টো বড়ুয়া, সিরাজ, ওসমান, আকিব, শামীম, বাবু চৌধুরী, রেজাউল করিম, রাইহান, সোহেল, হুমায়ুন, সোহেল, রাব্বি, আনোয়ার, শায়লা শাবনাজ জুনি, নাইমা আক্তার, সারিকা আমিন রিপা, জান্নাতুল মাওয়া, জেবা, প্রিংতি বড়ুয়া সহ অসংখ্য নেতৃবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।

নবীন শিক্ষার্থীদের উদ্দেশ্যে কলেজ ছাত্রলীগ সভাপতি টিপু বলেন, নৈতিক শিক্ষা অর্জনের পাশাপাশি সকল শিক্ষার্থীদের উচিত দেশের সুশৃঙ্খল সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগের পতাকা তলে সমবেত হওয়া। জাতীর পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শকে বুকে ধারণ করে বাংলাদেশ আওয়ামীলীগ সভানেত্রী, প্রধাণমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করে দেশের উন্নয়ন অগ্রগতি এগিয়ে নিতে হবে আগামী প্রজন্মকে।

ফরিদপুরে জাতীয় স্থানীয় সরকার দিবস -২০২৩ উদযাপন  উপলক্ষে র‍্যালি

টিটুল মোল্লা, ফরিদপুর।। 

ফরিদপুরে জাতীয় স্থানীয় সরকার দিবস উপলক্ষে,”সেবা উন্নতির দক্ষ রুপকার,উন্নয়নে – উদ্ভাবনে স্থানীয় সরকার” শীর্ষক” ব্যানারে জাতীয় স্থানীয় সরকার দিবস-২০২৩ইং উদযাপন উপলক্ষে একটি বর্ণাঢ্য রেলি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

স্থানীয় সরকার বিভাগের ভারপ্রাপ্ত উপপরিচালক ইয়াছিন কবিরের সভাপতিত্বে এই স্থানীয় সরকার দিবস-২০২৩ইং উদযাপনে বর্ণাঢ্য রেলি ও আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়।

এ সময় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন,ফরিদপুর জেলা প্রশাসক “কামরুল আহসান তালুকদার” বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন,জেলা পরিষদের প্রধান প্রশাসক রওশন ইসলাম,জেলা অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (সদর সার্কেল) শেখ মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ বিন কালাম,ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইশতিয়াক আরিফ,পৌর মেয়র অমিতাভ বোস, এলডিইডি’র প্রধান নির্বাহী প্রকৌশলী শহিদুজ্জামান খান,জেলা জনস্বাস্থ্য ও নির্বাহী প্রকৌশলী শুভম রায়, ফরিদপুর উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুর রাজ্জাক মোল্লা,ফরিদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি হাবিবুর রহমান হাবিব,আধা সরকারি ও এনজিও সংস্থার কর্মকর্তা’সহ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ার বিভিন্ন সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।

এ সময় বক্তারা জাতীয় স্থানীয় সরকার দিবস অনুষ্ঠিত হওয়ার ফলে সাধারণ জনগণের মাঝে বর্তমান সরকারের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল হয়েছে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন।

সংযমের শিক্ষা রোজা’য় “ইফতারি প্রথা” অমানবিক

রমজান রহমতের এবং  বরকতময় মাসের নাম। ত্যাগ ও সংযম এর  মহান বার্তা নিয়ে হাজির হয় পবিত্র  রমজান মাস।এই মাসে সেহেরি এবং ইফতারের মাধ্যমে একটি আলাদা স্বাদ উপভোগ করে রোজাদার মুসলমানগণ।রাসুল (সাঃ) এর ঘোষণা মতে  “এই মাসেই  হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ রজনী লাইলাতুলকদর”।বিশ্বের বিভিন্ন মুসলিম দেশে রমজান উপলক্ষে জিনিসপত্রের দাম কমিয়ে রেখে সরবরাহ বৃদ্ধি করে,কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে, আমাদের দেশে দ্রব্যমূল্যের বৃদ্ধি আর ভেজাল খাদ্যের দাপটে রোজাদাররা ক্রয়ক্ষমতা হারায়। আবার  সামাজিকতার নামে মেয়ের শশুর বাড়িতে ইফতারি পাঠানোর কুপ্রথায় হাঁপিয়ে উঠে মেয়ের বাবা। ফলে রোজার ফজিলতের  সংযম,  ত্যাগের মহিমা এবং ভাবগাম্ভীর্যতা নষ্ট হয়ে পড়ে।

সংগৃহীত একটি গল্পের আদলে পবিত্র রমজানের মাহাত্ম্য  তুলে ধরার চেষ্টা করছি,”জাপানিজদের কাছে রোজা একটি বিস্ময়ের নাম। সারাদিন না খেয়ে থাকতে হবে। কিন্তু কেন”? এই না খাওয়া নিয়ে তাদের আরো মজার মজার প্রশ্নও আছে। তারা যেসব প্রশ্নগুলো করে, পানিও খাওয়া যাবে না?সিগারেটও না?লুকিয়ে যদি খাও?যদি শাওয়ারে ঢুকে পানি খাও?রোজাদার বাঙালী অনেক হেসে বলে,  লুকিয়ে কেন খাবো?আমিতো ইচ্ছে করলে বিরিয়ানী রেঁধে ঘরে বসেই খেতে পারি। কিন্তু ভোর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত  আমরা কিছুই খাইনা।এটা মহান আল্লাহতালার নির্দেশ। এতে আমরা অভ্যস্ত।তখন শুরু হয় বিস্ময়ের আরেক ধাপ।আবারও একগাদা প্রশ্ন করে জাপানিজ  :”কেন খাও না?অদৃশ্য খোদা বলেছেন বলে?তিনি দেখতে পাবেন বলে?তোমাদের এত সংযম!এতটাই আত্মনিয়ন্ত্রণ!!!এরপর জাপানিজ  যে দুটো প্রশ্ন করে তাতে বাক্যহারা হয়ে পড়েন রোজাদার বাঙালী।জাপানিজের প্রশ্ন ছিল, “তবে তো তোমাদের দেশে কেউ মিথ্যা কথা বলে না,ঘুষ খায়না,কেউ পাপ করে না,পুলিশ ও লাগে না”।তখন রোজাদার বাঙালীর মুখ থেকে কোন কথা বের হয় না কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে যায়। কারণ আমরা জানি ৯০% মুসলমানের দেশ আমাদের।মুষ্টিমেয় হয়তো কিছু মানুষ ছাড়া সবাই রোজা রাখে।কিন্তু আমরা কি বলতে পারবো,রমজানের মধ্যেও মিথ্যা কথা বলা বন্ধ হয়েছে? প্রতারণা, জোচ্চুরি,মোনাফেকি বন্ধ? রমজানে যে খাদ্য দিয়ে ইফতার  হয়,সেহেরি খাওয়া হয় তার মধ্যে ভেজাল মিশানো হচ্ছে কিনা,পণ্য গুদামজাত করে বেশি টাকা মুনাফা করা বন্ধ  হচ্ছে কিনা, মানুষের হক মেরে খাওয়া বন্ধ হচ্ছে কিনা।অফিস পাড়ায় ঘুষ লেনাদেনা বন্ধ হয়েছে কিনা।ত্যাগ ও সংযমের শিক্ষা নিয়ে রমজান আমাদের দীক্ষিত করতে আসে প্রতিবছর ঘুরে ঘুরে। এই বছর রমজানের সময়টাতে তাপমাত্রা ৪১ডিগ্রী সেলসিয়াসের ঘরে। সারাবিশ্বের মানুষ হেরে যাচ্ছে তাপমাত্রার কাছে।গরমে পিপাসায় কাতর রোজাদার তবুও রোজা রেখে   তাপমাত্রাকে হারিয়ে দিচ্ছে। সারাদিন রোজা, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ এবং তারাবির নামাজও আদায় করা হয়।কিন্ত এই কঠিন সাধনার ফলপ্রসূ উপলব্ধি আমাদের কতটা তাড়িত করছে। শিরক, কুফরি, সুদ, ঘুষ, মিথ্যাচার, লোভ, হিংসা অহংকার থেকে কতটা মুক্ত হতে পেরেছে    মানুষ।প্রশ্ন থেকে যায় অনেক,অনেক প্রশ্ন।

পবিত্র রোজার  মাসে আমাদের সমাজে  কিছু কুপ্রথা রমজানের মাহাত্ম্যকে নিন্দিত করতে দেখা যায়। তারমধ্যে একটি হলো মেয়ের শশুর বাড়িতে ইফতারি দেওয়ার প্রথা।দরিদ্র পরিবারের জন্য এই প্রথাটি একপ্রকার অমানবিক এবং জঘন্যতম আর ধনীদের জন্য বিলাসিতা ।এই প্রথার প্রচলন মহামারী আকারে ছড়িয়ে শিকড় গেঁড়ে বসে আছে দেশের সকল জায়গায়। সাধারণত: বাঙালী সমাজে মেয়েদের তার পরিবার সব সময় দেখভাল করে। সুখী দেখতে চায়।তাই বিভিন্ন সময়ে বিশেষ কিছু দিনে মেয়ের জন্য হাদিয়া হিসেবে কিছু খাদ্য কিংবা জিনিস পাঠানো হয়।বাঙালী মুসলমানদের প্রাচীন একটি রীতি হচ্ছে মেয়ের শশুর বাড়িতে ইফতারি পাঠানো ।সামাজিক বন্ধনের  এটি ছিল একসময় আনন্দের।বাবার  সাধ্যমতে দেওয়া হতো কোন বাধ্যগত ছিল না। এবিষয়ে নবী করিম (সাঃ)বলেছেন, “তোমরা একে ওপরকে হাদিয়া দাও,যেন তোমাদের মাঝে ঋদ্ধতা বৃদ্ধি পায়”।
কিন্তু মেয়ের শশুরবাড়ির লোকজন যখন বাধ্যগত ভাবে তাদের চাহিদা মতো দাবি করে  এবং কনের উপর ক্রমাগত চাপ প্রয়োগ করে,মানষিক নিপীড়ন চালান,  তখন  ইফতারি আর  সামাজিক বন্ধনের পর্যায়ে  থাকে না,হয়ে যায় সামাজিকতার নামে মেয়ের বাবার উপর  অবিচার।যা অহরহ হচ্ছে। কখনো দেখা যায় সন্তোষজনক ইফতার না পাঠানো হলে মেয়ের উপর ঘটে মানষিক ও অমানবিক নির্যাতন।কটুকথা অশ্রাব্য গালাগাল। এমনকি শারীরিক ভাবে ও নির্যাতন করা হয়।আদরের মেয়ের সুখের আশায় অনেক বাবা ঋণ করে,গরু বিক্রি করে মেয়ের শশুর বাড়ির চাহিদা মেটায়, আর রাতে ঋণে জর্জরিত বাবা একেলা বালিশে মাথা রেখে কাঁদে।নবী করিম (সাঃ) বলেছেন, “কেউ যদি কাউকে একটি খেজুর দিয়ে ইফতার করায় তাহলে সে রোজাদারের সওয়াব পাবে”। আর বর্তমান সময়ে   জোর করে কনের বাপের বাড়ি থেকে ইফতার আদায় করায়  সওয়াব তো হবেই না বরং গোনাহের কাজ হবে। পবিত্র কোরানের সুরা বাকারা  (১৮৩) আয়াতে এরশাদ হচ্ছে, “হে ঈমানদারগণ ফরজ করা হয়েছে তোমাদের উপর রোজা যেমন ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তী লোকদের উপর। যাতে তোমরা সংযমী হতে পারো।মোত্তাকী ও পরহেজগার হতে পারো”।
সর্বোপরি  মানুষের অন্তরে তাক্বওয়া’র গুণ সৃষ্টির লক্ষ্যে রোজাকে অবশ্যই পালনীয় ফরজ করা হয়েছে। তাক্বওয়া অর্থ হলো আল্লাহতালার প্রতি ভালবাসা ও ভয়ের অনুভূতি।এই “ত্বাকওয়া” ই হচ্ছে রোজার আসল কথা।ইসলামীক বিশারদদের মতে, “পৃথিবীতে পাপ-পঙ্কিলতার কাঁটা ছড়ানো রয়েছে, তা থেকে সতর্কভাবে নিজেকে বাঁচিয়ে চলার নাম হলো তাক্বওয়া”।আর এর অভাবের কারণেই  রমজান মাসে  ইফতারি নিয়ে মেয়ের শশুর বাড়ির অযাচিত চাহিদা, ব্যবসায়ীদের খাদ্যে ভেজাল মিশানো, ঘুষ দূর্নীতি চলছে, যা কাম্য নয়।

যৌতুক প্রথা সমাজের  একটি অভিশাপের নাম। মুখে যতই যৌতুক বিরোধী কথা বলা হয় না কেন   , মেয়ের শশুর বাড়ির সন্তুষ্টি এবং মেয়ের  সুখের জন্য প্রায় বাবা মেয়ের বিয়েতে বিভিন্ন আইটেমের জিনিস দিয়ে থাকে সাধ্যমতে।আজকাল বিভিন্ন শ্রেণি পেশার মানুষের  অনেক মেয়ে বিয়ে হচ্ছে না যৌতুকের  টাকার জন্য। রাস্তা-ঘাটে খেয়াল করলে দেখা যায়  যে, অনেক গরীব মা-বাবা মেয়ের বিয়ের জন্য মানুষের দ্বারে দ্বারে  হাত পাতে,ভিক্ষা করে।যৌতুক প্রথার কারণে  বিবাহ উপযুক্ত বহু  মেয়ে পরিবারের বুঝা হয়ে আছে অনেকের । কিন্তু ইসলামের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় যে, ইসলামই নারীদের সর্বোচ্চ সন্মান দিয়েছে। নিরাপত্তা  দিয়ে হেফাজত করেছে। কিন্তু আজকাল সমাজে চলমান কিছু  বিষয়  ইসলামের মুল রীতিনীতির বিপরীত। সভ্যতার নামে অসভ্যতা।বিভিন্ন আইটেমের ইফতার সহ ঈদে মেয়ের  শশুর বাড়িতে সবাইকে কাপড়,কোরবানের গরু কিংবা ছাগল সহ বিভিন্ন সময়ে পাঠানো জিনিস যৌতুকেরই শামিল। খবরের কাগজ খুললেই দেখা যায় যৌতুক দিতে  অপারগতায় শশুর বাড়ির নির্যাতনে   অনেক মেয়ের  মৃত্যু এবং বিবাহ ভেঙ্গে  যায়। এই কুসংস্কার কত যে ভয়ানক তা একমাত্র ভুক্তভোগী পরিবারই জানতে পারে। তাই এসব কুপ্রথা থেকে বেরিয়ে আসতে না পারলে ভবিষ্যতে আরো কত মেয়ে তার শশুর বাড়িতে অত্যাচারিত হতে পারে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। ইফতার সুন্নত। কাউকে ইফতার করানো নিঃসন্দেহে  সওয়াবের কাজ। কিন্তু ইফতারি  কুপ্রথার বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানোর তাগিদ দিচ্ছেন সমাজ নিয়ে কাজ করা বিশেষজ্ঞ মহল।আলেম সমাজ বিষয়টি নিয়ে  মাহফিলে বয়ান করতে থাকলে,  সাধারণ মানুষ বেশী করে মেনে চলবে, আশাবাদী সাধারণ মানুষের।

রোজার দিনে এক মা তাঁর সন্তানকে নিয়ে রিক্সায় বাড়ি ফিরছিলেন। প্রতিজন মা’রই তার সন্তানের প্রতি গভীর ভালবাসা থাকে। সন্তানের চেহারা দেখে বলতে পারে সুখ, দুঃখ,  ক্ষুধা, তৃষ্ণা এবং সুশিক্ষা নিশ্চিত করার দিকেও তার গভীর মনোযোগ থাকে। চলার পথে ছোট  সন্তানটি যখন মার কাছে জানতে চায়, “আচ্ছা মা না খেয়ে থাকলেই কি রোজা হয়?”মা তখন যথার্থ বলেছেন, “না বাবা রোজার সময় সংযম করতে হয়।অন্যের কষ্ট বুঝতে হয় আর মানুষের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করতে হয়”। কিন্তু শেষ কথাটি তিনি মনে রাখতে পারে না।তাই একটু পরেই প্রবীণ রিক্সাচালককে বেশ কর্কশ কন্ঠে তিনি বলে উঠেন,”আরে এত আস্তে রিক্সা চালালে তো ইফতার রাস্তায় করতে হবে। জোরে চালান”।রিক্সা চালক তখন অসহায় ভাবে জানান,”সারাদিন রোজা রেখে  আর জোরে রিক্সা চালানোর মত শক্তি নেই তার।কথা শুনে থ’হয়ে যান ঐ মা।রিক্সাওয়ালার প্রতি সন্তানের সামনে  তার খারাপ ব্যবহার এবং তার প্রভাব তার সন্তানের উপর পড়বে বুঝতে পারে মা।তখনই প্রবীণ রিক্সচালকের কাছে ক্ষমা চেয়ে নেন। তিনি পরিবারের জন্য আনা সমস্ত ইফতারের খাবার মুরুব্বি রিক্সাওয়ালাকে দিয়ে দেন।রোজার মাসের সংযমের শিক্ষা সবার মাঝে ঋদ্ধতা নিয়ে আসুক।মাহাত্ম্য এখানেই।

সবধরনের খারাপ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রেখে, শুদ্ধ হওয়ার পথে অগ্রসর হওয়াই রমজানের শিক্ষা ।ব্যবসার নামে যদি অনৈতিকতা এবং কুপ্রথায় অমানবিকতা প্রদর্শন করা হয় তাহলে,যে রমজান  উচ্চ নৈতিক চরিত্র, উন্নত মানবতাবোধ,ত্যাগ,শিক্ষা দেয়,এই পবিত্র মাসের আমল-ইবাদতের সঙ্গে চরম অবমাননাই করা হয়।
————–


লেখক-বদরুল ইসলাম বাদল
সদস্য, বঙ্গবন্ধু ফাউন্ডেশন কেন্দ্রীয় কমিটি.

Read more

1 2 3 21