শরীয়তপুরে অসহায় বিধবার ঘর ভেঙ্গে দিলেন বিএনপি নেতা এড কামরুল

নিজস্ব প্রতিবেদক।।   

সারা জীবন অন্যের বাড়িতে ঝিয়ের কাজ করে পাঁচ সন্তান নিয়ে খেয়ে না খেয়ে ৬ শতাংশ জমি ক্রয় করেছিলেন অসহায় বিধবা মারুন বেগম ওরফে ফাতেমা। বসতঘর নির্মানের জন্য ৬মাস পূর্বে সেই জমিতে ধার দেনা করে মাটি কেটে ভিটি বাধেন এবং চারপাশে গাছপালাও লাগান মারুন বেগম। ইদানিং সেই স্বপ্নের বাড়িতে মারুন যখন ঘর তুলছিলেন তখনই বাঁধা হয়ে দাড়ান জেলা বিএনপির দপ্তর সম্পাদক ও শরীয়তপুর জজকোর্টের আইনজীবী এড. মুহাম্মদ কামরুল হাসান (শাহ আলম)।  তিনি বিধবার বাড়ির নির্মাণ সামগ্রী ভেঙ্গে গুড়িয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ করেন মারুন। তবে বিএনপি নেতা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। 

 

জানা গেছে, শরীয়তপুর সদর উপজেলার পশ্চিম চররোসুন্দী গ্রামের দরিদ্র নূরমোহাম্মদ মোল্যার স্ত্রী মারুন বেগম ওরফে ফাতেমা। দশ বছর পূর্বে স্ত্রী, তিন মেয়ে ও দুই ছেলে রেখে মারা যান নূরমোহাম্মদ মোল্যা। এরপর থেকেই শুরু হয় মারুন বেগমের জীবন যুদ্ধ। গ্রামে স্বামীর তেমন জায়গা সম্পত্তি না থাকায় ৫ ছেলে-মেয়ে নিয়ে আংগারিয়া এলাকায় গিয়ে অন্যের বাড়ি বাড়ি গিয়ে ঝিয়ের কাজ করে ছেলে-মেয়ে নিয়ে কোন মতে জীবন বাচান। অন্যের দয়ায় অন্যের বাড়িতে আশ্রয় থেকে কোন মতে বেচে আছেন মারুন বেগম। এতো কষ্টের মধ্যেও টাকা জমিয়ে শরীয়তপুর পৌরসভার ৮ নং ওয়ার্ডের ৭৭ নং স্বর্ণঘোষ মৌজায় দুই বছর আগে ৬ শতাংশ জমি ক্রয় করেন মারুন বেগম। 

 

মারুন বেগম অভিযোগ করে বলেন, আমি মানুষের বাড়ি বাড়ি কাজ করে ছেলে-মেয়ে নিয়ে বেচে আছি। আমার তিলে তিলে জমানো টাকা দিয়ে আমি একটু জমি কিনেছি। সেই জমিতে ঘর তোলার জন্য মাটি কেটেছি। যখন আমি সেই জমিতে ঘর তুলতে গেছি তখনই এড. কামরুল হাসান শাহ আলম বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। সে আমার ঘর ভেঙ্গে দিয়েছে। আমি এখনে ঘর তুলতে গেলে আমাকে মেরে ফেলবে অথবা মিথ্যা মামলা দিয়ে জেল খাটাবে। আমি অন্যের বাড়ি আশ্রয় থাকি। আমার থাকার কোন জায়গা নেই।  

 

এ বিষয়টি আমি পালং মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ করেন। পালং থানার ওসি বিষয়টি আমলে নিয়ে দুই পক্ষকে নিয়ে বসে ঘর ভাঙ্গা বাবদ ৩০ হাজার টাকা জরিমানা করে ৩ দিনের মধ্যে বিষয়টি সুরাহা করার জন্য বলেন। 

কিন্তু বিএনপির নেতা নিজস্ব ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে টাকা পরিশোধ না করে উল্টো তাহার নিজস্ব সন্ত্রাসী বাহিনী নিয়ে প্রকাশ্যে অস্ত্র দেখিয়ে আমাদের মৃত্যুর হুমকি দিয়ে যাচ্ছেন। আমি এর সুষ্ঠু বিচার চাই। 

 

এড. মুহাম্মদ কামরুল হাসান (শাহ আলম) অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি কারো ঘর ভাঙ্গিনি। আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা উদ্দেশ্যমূলক। 

 

এ বিষয়ে জানার জন্য পালং মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আক্তার হোসেনের বলেন আমি বিষয়টি অবগত আছি মহিলা সুস্থ বিচার পাবে  ঘর তুলে দেওয়ার ব্যাবস্হা আমি করছি।

তিন প্রতিবন্ধীর দিন কাটছে চিকিৎসা ও অর্থ কষ্টে

নিজস্ব প্রতিনিধিঃ
শরীয়তপুরে ভেদরগঞ্জ উপজেলার ছয়গাঁও ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের নাজিম পুর গ্রামের একটি হতদরিদ্র পরিবারের ৪ জন সদস্যদের ৩ জনই প্রতিবন্ধী।

চিকিৎসা এবং অর্থকষ্টে দিন কাটছে তাদের। এর মধ্যে মা রোকেয়া বেগম (৫০) শুধু ভালো রয়েছেন, তবে তার তিন সন্তান মোঃ আলম চৌকদার (২৮), মোঃ জহির ইসলাম চৌকদার (২৫), এবং এক মেয়ে তানজিলা (২৩) প্রতিবন্ধী হয়ে ঘরেই দিন কাটাচ্ছে বলে জানা এবং দেখা গেছে।

 

সরেজমিনে গিয়ে আরও জানা গেছে, পরিবারে প্রতিবন্ধী ৩ সন্তান কে দেখার জন্য শুধু তাদের মা রয়েছেন, বাবাও প্রতিবন্ধী অবস্থায়ই মারা গেছেন। এমনকি হতদরিদ্র পরিবারটির ঘরে তাদের বাবার বাবা অর্থাৎ তাদের দাদাও এই প্রতিবন্ধী হয়ে মারা গেছে বলে জানান মা রোকেয়া বেগম।

তবে প্রশ্ন রয়ে যায় এখানে প্রতিবন্ধী হয়ে মারা যায় বিষয় টি আসলে কী!

প্রতিবন্ধী তিন সন্তানের জননী রোকেয়া বেগম কে প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, আমার যখন বিয়ে হয় তখন ওদের বাবা ভালো ছিলেন, পরে আস্তে আস্তে তার শরীর অন্য রকম হতে থাকে। অর্থাৎ শরীর শুকিয়ে চিকন হয়ে যায় এবং কথা বলতে সমস্যা হয়ে যায়। এমনকি হাটা চলা শেষে বন্ধ হয়ে যায়, এবং এক সময় মারা যায়।

তিনি আরও জানান,আমার শশুরও এ রোগে মারা যান, আমার বড় ছেলেও এভাবেই মারা যায়। আমি বুঝতে পারি না আমার সন্তান গুলো পর্যন্ত বড় হয়ে আস্তে আস্তে শরীর হাত পা অন্য রকম হয়ে এবং এক সময় হাঁটাচলা বন্ধ হয়ে সেই সাথে কথা বলা পর্যন্ত সমস্যা হয়ে একসময় মারা যাচ্ছে।

আমার এক মেয়ে তানজিলা আক্তার (২৩) সম্পূর্ণ সুস্থ ছিলো ভালো ছিলো বিয়ের আগে, সমাজের দশজনে দেখে শুনে নিলো পাশের বাড়ির রুবেল গাজীর সাথে বিয়ে দিলাম, সন্তান হয়েছে। এখন আমার ভালো মেয়েটা আস্তে আস্তে প্রতিবন্ধী হয়ে যাচ্ছে। এই অবস্থা দেখে আমার মেয়েটাকে রেখে অন্য যায়গায় বিয়ে করে এখন আর আমার মেয়ের কোন খোঁজ খবর নেয় না মেয়ের জামাই।

কথাগুলো বলার সময় দুচোখ দিয়ে গড়িয়ে গড়িয়ে পানি পড়তে ছিলো দুঃখী মায়ের। দুই বছর হয় বড় ছেলে আলামিন (৩০) দীর্ঘ ১০ বছর প্রতিবন্ধী জীবন কাটিয়ে এ রোগেই মারা যায় বলে জানান মা রোকেয়া বেগম। বর্তমানে এখন আমার মেজো ছেলে মোঃ আলম (২৮) বিদেশ ঘুরেও এসেছে এবং ভালো ছিলো এখন ৮ বছর যাবৎ প্রতিবন্ধী হয়ে ঘরে বন্ধী হয়ে আছে এবং মোঃ জহির ইসলাম চৌকদার (২৫) ৪ বছর যাবৎ একি অবস্থা হয়ে ঘরে বন্ধী হয়ে আছে।

স্থানীয় লোকজন এবং এলাকাবাসী জানান, ওদের দাদা, ওদের বাবা, এবং ওদের এক ভাই এরকম হয়েই মারা গেছে। কেন এ রকম হয়ে যায় আমরা বুঝতে পারি না। ওরা আমাদের মতো এক সময় সুস্থ স্বাভাবিক ছিলো, কিন্তু আস্তে আস্তে ওরা এরকম হয়ে গেছে। এখন কথাও ঠিকমতো বলতে পারে না এবং হাটতেও পারে না। ওদের শুধু ওর মা ছাড়া আর কেউ দেখার নেই।

তবে তাদের পরিবার টি কিভাবে চলছে বিষয় টি জানতে চাইলে তারা বলেন, সামান্য কিছু টাকা ভাতা পায় আর এলাকাবাসী মাঝে মধ্যে কিছু দেয় তা দিয়েই কোন রকম চলছে।

তবে খুব কষ্টে কাটছে তাদের জীবন। না আছে ভালো একটা থাকার ঘর, না আছে তাদের সংসারে উপার্জনকারী কেউ। তাই আমরা চাই সরকারীভাবে তাদের জন্য একটা ঘর এবং তাদের আর্থিক কোন সহযোগিতা করলে হয়তো একটু ভালো থাকতে পারবে।

প্রতিবন্ধী তিন সন্তানের জননী রোকেয়া বেগম বলেন,আমার এই তিন সন্তান নিয়ে আমি খুব কস্টের মধ্যে দিন কাটাচ্ছি, সংসারে কামাই করার মতো কেউ নেই। তাই যদি সরকার আমার সন্তানদের দিকে তাকিয়ে আমাকে একটা থাকার ঘর এবং আর্থিক সহযোগিতা করতো তাহলে হয়তো এতো কষ্ট করতে হতো না।

এদিকে পরিবারটির বিষয়ে শরীয়তপুর নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সভাপতি মোঃ আবুল কালাম আজাদ এবং সাধারণ সম্পাদক মোঃ জুয়েল আহমেদ মোল্লা বলেন, যদি প্রতিবন্ধী ভাতা প্রদানের পাশাপাশি সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগে এই প্রতিবন্ধীদেরকে আর্থিক সহায়তা করা হয় তাহলে হয়ত অসহায় প্রতিবন্ধীদের বেঁচে থাকাটা সহজ হবে। এজন্য মানবিক কারণে হলেও সরকারী-বেসরকারী উদ্যোগের পাশাপাশি শরীয়তপুর জেলার প্রবাসী ও বিত্তবানদেরকেও এ অসহায় পরিবারকে সহযোগিতার হাত প্রসারিত করা বড়ই প্রয়োজন।

এ বিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলার সমাজসেবা অফিসের কর্মকর্তা তাপস বিশ্বাস বলেন, ভেদরগঞ্জ আমি নতুন জয়েন করেছি। তাই বিষয়টি আমার জানা নেই।

এ বিষয়ে ভেদরগঞ্জ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তা তানভীর আল নাসিফ বলেন, ছয়গাঁও ইউনিয়নের একই পরিবারের তিনজন প্রতিবন্ধী বিষয়টি আমার জানা ছিলো না, আপনার মাধ্যমে জানতে পারলাম। এই পরিবারের বিষয়ে খোঁজ খবর নিয়ে তাদের জন্য সব ধরনের সুযোগ সুবিধা দেয়ার চেষ্টা করবো।